পবিত্র রমজান মাসে সারা দেশে যখন সেহরি ও ইফতারের নানা পদের আয়োজনে ব্যস্ত মানুষ, তখন কুড়িগ্রামের উলিপুরে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা রূপভান বেগমের দিন কাটছে চরম অনাহারে-অর্ধাহারে। যেখানে অনেক পরিবারে ইফতার টেবিলে থাকে বাহারি খাবারের আয়োজন, সেখানে তার সেহরি ও ইফতার সেরে যায় আগের দিনের পান্তা ভাত দিয়ে।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের জনতাহাট গ্রাম। এনজিওর দেওয়া একটি ছোট্ট জায়গায় জরাজীর্ণ একটি খুপড়ি ঘর সেখানেই বাস করেন রূপভান বেগম। বয়স সত্তর পেরিয়েছে অনেক আগেই। প্রায় দুই দশক আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। নেই কোনো সন্তান, নেই দেখভালের মতো আপনজন। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া এই নারী এখন কেবল বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন লড়াই করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলেও তার ঘরে জ্বলেনি চুলা। নেই রান্নার কোনো আয়োজন। আগের দিনের এক বাটি পান্তা ভাতই তার সেহরি ও ইফতারের ভরসা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রূপভান বেগম বলেন বাবা শরীর আর চলে না। আগে মানুষের বাড়িতে কাম করিয়া খাইতাম, এ্যালা আর শক্তি নাই। কাইও দিলে খাই। রাইতোত একজনে ভাত দিছে তা খাইয়া রোজা থাকছি। গতকাল রাইতে ভাত আছিল, তাই রাখছি ইফতারোত ওই পান্তা ভাত খামো। রূপভানের এই করুণ অবস্থা দেখে প্রতিবেশীরাও ব্যথিত। তবে নিজেদের অভাব-অনটনের কারণে তার পাশে সবসময় দাঁড়ানো সম্ভব হয় না।
প্রতিবেশী ছালেহা বেগম বলেন আমরা নিজেরাই গরিব মানুষ। তার ওপর বাজারের জিনিসের দাম এত বেশি যে নিজেদেরই চলা দায়। তারপরও দয়া লাগে মাঝে মাঝে এক মুঠো চাল বা এক বাটি ভাত দিয়া আসি। কিন্তু তাতে কয়দিন চলে?
আরেক প্রতিবেশী আবদুল জলিল বলেন রূপভান দাদীর অবস্থা খুব খারাপ। কেউ খবর নেয় না। ইফতার করার মতো খাবার উনার ঘরে থাকে না। আমরা গ্রামবাসী মিলে মাঝে মাঝে একটু সাহায্য করি কিন্তু সেটা তো যথেষ্ট না।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে নি¤œ আয়ের মানুষের জীবন এখন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি মাহবুব আলম বলেন রূপভান বেগমের চিত্র কেবল একজনের নয়। উলিপুরে এমন অনেক নিঃসঙ্গ প্রবীণ রয়েছেন যারা এই রমজানেও অভুক্ত থাকছেন। সরকারি সহায়তার সঠিক বণ্টন এবং সমাজের বিত্তবানদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তাদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে রূপভান বেগমের চাওয়া খুবই সামান্য। প্রতিদিন অন্তত দুই বেলা দু’মুঠো ডাল-ভাত খেয়ে শান্তিতে ইবাদত করতে চান তিনি। রমজানের এই ত্যাগের মাসে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষের সামান্য সহমর্মিতাই পারে রূপভান বেগমের মতো নিঃসঙ্গ মায়েদের বিবর্ণ জীবনে একটুখানি হাসি ফোটাতে।