সারি সারি বেঞ্চ। অথচ শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী মাত্র একজন। হাতে বই নিয়ে একা বসে আছে অষ্টম শ্রেণির বৃষ্টি আক্তার। শিক্ষকের অপেক্ষায় থাকলেও বেশ কিছুক্ষণ পরও কেউ শ্রেণিকক্ষে আসেননি। পাশের কক্ষে কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীকে গল্প-আড্ডায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন। অন্য একটি কক্ষে এক শিক্ষিকা নিজের শিশুকে মেঝেতে শুইয়ে রেখেছেন।
কাগজে শিক্ষার্থী ১৮৮ জন। তাদের পাঠদানের জন্য শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৯ জন। প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা বাবদ দেওয়া হচ্ছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৪ টাকা। কিন্তু সরেজমিনে শ্রেণিকক্ষে পাওয়া গেল মাত্র একজন শিক্ষার্থী।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ মৌজার হাসারপাড় বড়বাড়ি গ্রামের বড়বাড়ী মহসিনিয়া দাখিল মাদ্রাসায় বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত। মাদ্রাসার তথ্য অনুযায়ী, এখানে শিক্ষক ১৪ জন ও কর্মচারী পাঁচজন।
প্রতিষ্ঠানের নথি অনুযায়ী, প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। পঞ্চম শ্রেণিতে ২২, ষষ্ঠে ২৪, সপ্তমে ২৭, অষ্টমে ৩৪, নবমে ৪১ এবং দশম শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী ১৮৮ জন। তবে সরেজমিনে অষ্টম শ্রেণির বৃষ্টি ছাড়া অন্য কোনো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়নি।
বৃষ্টি আক্তার বলে, ‘আমরা মাদ্রাসায় প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন করে আসি। ক্লাস বেশি হয় না। তাই শিক্ষার্থীও আসে না।’
শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। চলতি বছরের দাখিল/এসএসসি সমমান পরীক্ষায় এ মাদ্রাসা থেকে ৩১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে মাত্র দুজন।
স্থানীয় বাসিন্দা নুর ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখানো হলেও দাখিল পরীক্ষার সময় হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে লোক এনে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়। তাদের অটোভাড়া, খাবার ও পকেট খরচ দেওয়া হয়।’
সাবেক শিক্ষার্থী সাগর ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, মাদ্রাসা থেকে পাস করার পর তাঁকে অন্যের হয়ে তিনবার প্রক্সি পরীক্ষা দিতে হয়েছে। এ জন্য অটোভাড়া ও পকেট খরচ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মাদ্রাসাটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি স্বীকৃতি পায়। এর EIIN নম্বর ১২২৫১৭ এবং ইনস্টিটিউশন নম্বর ৮৮০৭০৫২১০২।
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, আরও শিক্ষক নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএতে শূন্য পদের চাহিদা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পায়।
মাদ্রাসার সহকারী সুপার আব্দুস সুবহান বলেন, ‘মাদ্রাসাটি তিস্তা নদীর পাশে এবং হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না।’
সুপার শাহালম বলেন, আশপাশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় আসে না। হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে যারা ভর্তি হয়, তাদের অনেকেই গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল।
মাদ্রাসার শিক্ষক সামছুল হক বলেন, ‘মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী এমনিতেই কম। সেটা সবাই জানে।’
মাদ্রাসার সভাপতি ও কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক (ব্যবসায় শিক্ষা) মো. লাল মিঞা সরকার বলেন, তিনি শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি অবগত। নদী এলাকা ও হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝিয়ে মাদ্রাসামুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
রাজারহাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘দুই-একদিনের মধ্যে পরিদর্শন করাবো। সমস্যা পাওয়া গেলে অবশ্যই রিপোর্ট করে পাঠিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
নথিতে ১৮৮ শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী ১৯ জন। অথচ ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে সরেজমিনে শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত পাওয়া গেছে মাত্র একজন শিক্ষার্থী। এ অবস্থায় নথিভুক্ত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, নিয়মিত পাঠদান, পরীক্ষার ফলাফল এবং সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি ও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।