কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী জুম্মার হাট। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই জনপদেই ২০০৩ সাল থেকে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে সাকসেস রেসিডেন্সিয়াল স্কুল। জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও সাফল্যকে মূলমন্ত্র করে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি এখন এলাকার শত শত শিক্ষার্থীর স্বপ্নপূরণের ঠিকানা।
বিদ্যালয়টির এডুকেশনাল ইনস্টিটিউট আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (ইআইআইএন) ১৩৯১১৮ এবং বিদ্যালয় কোড ৫৮৭২। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
উলিপুরে অম্বিকা চরণ রায় শিক্ষাবৃত্তি প্রদান
সরেজমিনে দেখা যায়, সাদা দেয়াল ও লাল পিলারে সাজানো পরিপাটি শ্রেণিকক্ষ, সিসি ক্যামেরার আওতায় নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং খোলামেলা পরিবেশ। প্রায় দেড় বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা বিদ্যালয়টির রয়েছে বিশাল খেলার মাঠ। মাঠে উড়ছে লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা। সকালে সাদা ও নেভি ব্লু ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের সারিবদ্ধ উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৭৮০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন ৪৯ জন শিক্ষক ও সাতজন কর্মচারী।
৩০ বছরের শিক্ষকতা শেষে বিদায়, অশ্রুসিক্ত বালারহাটের ২ শিক্ষক
প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রাথমিক সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি ও বৃত্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে বিদ্যালয়টি। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য নেওয়া হয়েছে ‘স্কলারশিপ প্রিপারেটরি প্যাকেজ প্রোগ্রাম-২০২৬’। পাশাপাশি দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে অতিরিক্ত যত্ন ও পাঠদানের ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যালোচনায় নিয়মিত আয়োজন করা হয় অভিভাবক সমাবেশ। বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস করলেই প্রয়োজনীয় পড়াশোনা সম্পন্ন করা সম্ভব বলে মনে করেন অভিভাবকদের অনেকে।
পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা ও নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এর অন্যতম উদাহরণ বিদ্যালয়ের স্কাউট দল। বাংলাদেশ স্কাউটসের নিবন্ধিত দলটি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ স্কাউটসের উপজেলা শাখা আয়োজিত দ্বিতীয় উপজেলা কাব ক্যাম্পুরী-২০২৬-এ অংশ নিয়ে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছে বিদ্যালয়টির কাব দল। এর আগে গুনাইগাছ ইউনিয়নভিত্তিক ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মনোমুগ্ধকর ডিসপ্লেও দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
উলিপুরে বিরোধের জেরে নির্মাণাধীন বাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ
শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনের ক্ষেত্রেও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগ। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘মায়ের ভাষা অন্তরে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সবার তরে’ স্লোগানে কাগজবাড়ি নামের একটি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবামূলক সংগঠনের উদ্যোগে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। এতে ৭৮০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনা মূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং পাঁচটি বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও অভিভাবকদের মতে, প্রত্যন্ত এলাকায় এমন সুশৃঙ্খল, প্রযুক্তিবান্ধব ও আদর্শভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা পুরো উপজেলার জন্য অনুকরণীয়। তাঁদের ভাষ্য, সদিচ্ছা, শৃঙ্খলা এবং শিক্ষক-অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে গ্রামেও মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক সাইদুল ইসলাম খন্দকার বলেন, ‘২০০৩ সালে জ্ঞানই আলো—এই মূলমন্ত্র নিয়ে জুম্মার হাটের মতো নিভৃত পল্লীতে যে স্বপ্নের বীজ বুনেছিলাম, আজ ৭৮০ জন শিক্ষার্থীর পদচারণায় তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। গুনাইগাছের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতেই এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম, ব্যবসার জন্য নয়; এটি আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করতে চাই, জন্ম গ্রামে হলেও গ্রামের সন্তানেরাও শহরের মতো মানসম্মত, প্রযুক্তিবান্ধব ও নৈতিক শিক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। আমাদের লক্ষ্য, বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস করেই শিক্ষার্থীরা যেন প্রয়োজনীয় শিক্ষা অর্জন করতে পারে এবং বাইরে প্রাইভেট-কোচিংয়ের জন্য ছুটতে না হয়। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি খেলাধুলা, স্কাউটিং ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের পাশাপাশি আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এই প্রতিষ্ঠানকে উলিপুর তথা কুড়িগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পরিণত করাই আমাদের আগামীর স্বপ্ন।’