মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন
এই মাত্র পাওয়া খবর::
বনানী থেকে গ্রেপ্তার ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের এমডি দিলীপ আগারওয়ালা শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার নাকি ইউনিয়ন পরিষদ: কোথায় যাবেন এমপিও শিক্ষক? তাসভীর উৎসবে সেরা অভিনেতা ‘দেলুপি’র চিরনজিৎ রৌমারী‌তে ব্রহ্মপু‌ত্রের তীব্র ভাঙন, গি‌লে খা‌চ্ছে ফসলি জ‌মি রৌমারীতে গোয়ালঘরে আগুন, পুড়ল ১৩ ছাগল ও ষাঁড় বিসিবির সন্তুষ্টি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দুয়ারে আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়াম ফুলবাড়ীতে মাছ ধরার জালে আটকা পড়েছে প্রায় ১৩ ফুট অজগর। ১০০ ফিট সড়কের ৯০ ফিটই দখলে, দেখার কি কেউ নেই? বজরা ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় যুবদল নেতা আল-আমিন খান লিমন ফুলবাড়ী‌তে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ
নোটিশঃ
*** কুড়িগ্রামনিউজ২৪.কম এ আপনাকে স্বাগতম * * * সবার আগে  জেলার খবর জানতে চোখ রাখুন***

শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার নাকি ইউনিয়ন পরিষদ: কোথায় যাবেন এমপিও শিক্ষক?

Reporter Name
Update : সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২২ অপরাহ্ন




একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক গতিশীলতা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করার পেছনে দুই ধরনের কাঠামোর ভূমিকা অনস্বীকার্য—একদিকে তৃণমূলের উন্নয়ন ও স্থানীয় সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘স্থানীয় সরকার’, অন্যদিকে জাতির ভবিষ্যৎ গঠন ও মানবসম্পদ তৈরির জন্য ‘শিক্ষা ব্যবস্থা’। কিন্তু সম্প্রতি এই দুই ব্যবস্থার সংযোগস্থলে তৈরি হয়েছে এক গভীর নীতিগত বিভ্রান্তি ও সাংঘর্ষিক বিতর্ক। এমপিওভুক্ত (Monthly Pay Order) বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন কি না—এ নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের ভিন্নমুখী বক্তব্য এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রখর প্রতিক্রিয়া দেশজুড়ে এক বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
​কয়েক দিন আগে আইনমন্ত্রীর এক বক্তব্যে শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষে ইতিবাচক ইঙ্গিত মিললেও, শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়িছিলেন যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। তবে ইদানিং শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে না।আবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর কণ্ঠে শোনা গেছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচন করতে বাধা নেই‌। এরই মাঝে বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দিলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। সরকারের ভেতরে নীতিগত ঐক্যের এই অভাব কেবল প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে না, বরং তৃণমূলের শিক্ষা ও স্থানীয় শাসনের সামগ্রিক শৃঙ্খলাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
​প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষক যদি একই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি (যেমন: ইউপি চেয়ারম্যান, সদস্য, পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর) হন, তবে তিনি কোন আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা মানবেন?
​

আইনি ও বিধিমালার দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতিমালার অধীন পরিচালিত দুটি আলাদা জগত। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা’ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশাবলী দ্বারা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এই বিধিমালা অনুযায়ী, একজন শিক্ষককে প্রতিদিন সকাল ৯টা বা সাড়ে ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সার্বক্ষণিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে হয়। প্রাত্যহিক সমাবেশ পরিচালনা, ডিজিটাল বা বায়োমেট্রিক হাজিরা প্রদান, নির্ধারিত পাঠ পরিকল্পনা অনুযায়ী দিনে ৩ থেকে ৫টি ক্লাস নেওয়া, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, এবং টিফিন ও ছুটির সময়ে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখা তাদের অর্পিত মূল দায়িত্ব।
​

এর বিপরীতে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি—তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য হোন কিংবা পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর হোন—তাকেও সার্বক্ষণিক জনসেবায় নিয়োজিত থাকতে হয়। নাগরিকত্ব সনদ প্রদান, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ভিজিডি-ভিজিএফ বা বয়স্ক ভাতার তালিকা তৈরি, স্থানীয় শালিস-বিচার, ড্রেনেজ ও রাস্তাঘাট সংস্কার তদারকি এবং জরুরি দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণের মতো কাজে তাকে প্রতিনিয়ত ইউনিয়ন পরিষদ বা নগর ভবনে উপস্থিত থাকতে হয়।
​সম্প্রতি কুড়িগ্রাম জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক লিয়াকত আলী এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত যৌক্তিক এক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজস্ব সংবিধিবদ্ধ বিধিতে চলে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুশাসনে চলেন না; তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাধ্যবাধকতায় থাকেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে প্রতিনিয়ত পরিষদের কার্যালয়ে বসতে হয় ও স্থানীয় জনগণের তদারকি করতে হয়। যদি একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হন, তবে তিনি কীভাবে বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বজায় রাখবেন? আর যদি কর্মঘণ্টা না মানেন, তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিধিমোতাবেক তাঁর এমপিও বাতিল এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। অর্থাৎ, শিক্ষকতা পেশায় থেকে জনপ্রতিনিধি হওয়ার চেষ্টা নীতিগতভাবেই একটি স্ববিরোধিতা। এখন দেখার বিষয় শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার নাকি ইউনিয়ন পরিষদ: কোথায় যাবেন এমপিও শিক্ষক?

দুর্গম চরের শিশুদের শিক্ষা উপকরণ দিল চর উন্নয়ন পরিষদ

​এখানে একটি আর্থিক বিষয়ও লক্ষ্যণীয়। সম্প্রতি নতুন জাতীয় বেতন কাঠামোর যে বিশ্লেষণ সামনে এসেছে, তাতে দেখা যায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক মর্যাদায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করা হচ্ছে। সহকারী শিক্ষক থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক ও ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষদের মূল বেতন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা প্রায় শতভাগ বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। যেখানে রাষ্ট্র শিক্ষক সমাজকে পূর্ণাঙ্গ সামাজিক মর্যাদা ও উপযুক্ত আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়ার পথে হাঁটছে, সেখানে একজন শিক্ষকের একই সময়ে অপর একটি নির্বাহী বা রাজনৈতিক পদে আসীন হওয়ার চেষ্টা কতটুকু যৌক্তিক?
​একই মানবদেহে দুটি ভিন্ন দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দিলে কোনোটিই সুচারুভাবে সম্পাদিত হতে পারে না। যদি একজন শিক্ষক জনপ্রতিনিধি হিসেবে দিনের সিংহভাগ সময় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করেন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা, ব্যাহত হবে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান। আবার যদি তিনি স্কুলে সময় দেন, তবে স্থানীয় সরকারের সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ তাদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ও সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
​আইনের কোনো অস্পষ্টতা বা ব্যাখ্যার মারপ্যাঁচে ফেলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির আখড়ায় পরিণত করার সুযোগ রাখা কোনো সুস্থ শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষণ হতে পারে না। রাজনৈতিক ফায়দা বা তাৎক্ষণিক সমাধানের কথা না ভেবে, সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন ও জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা। যদি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার বা অন্য যেকোনো নির্বাচনে অংশ নিতে চান, তবে তাদের প্রথমাংশে শিক্ষকতা পদ থেকে পদত্যাগ বা নিয়ম অনুযায়ী লিয়েন/ছুটি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।
​শ্রেণিকক্ষের চক-ডাস্টার এবং ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার নির্বাহী চেয়ার—দুটিই অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ স্থান। এই দুই ব্যবস্থার মধ্যে দেয়াল তুলে দেওয়াই শিক্ষা ও স্থানীয় শাসন—উভয়ের স্বকীয়তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার একমাত্র পথ।

লেখা : অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু। সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ক্রীড়া সংগঠক ও রাজনীতিবিদ।


এই বিভাগের আরও খবর....
Developed by- Ansari IT